সাভার রেজিস্ট্রারকে নিয়ে সমালোচনার ঝড় দেশজুড়ে, নেপথ্যে থাকা সকল বৈধ-অবৈধ লেনদেনের ক্যাশিয়ার সহকারী পলাশ মাসখানেক ছুটি শেষে ফের একই দপ্তরে বহাল তবিয়তে
বিআরএসএ মহাসচিব মাইকেল মহিউদ্দিনের শেল্টারে সাভার রেজিস্ট্রি অফিসের নকল নবিশ পলাশ দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলো। গনমাধ্যমের সামনে উঠে আসা সাব রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনের সকল বৈধ অবৈধ সম্পদের বিবরন ও অসদাচরণ গনমাধ্যমের সামনে উঠে আসায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার ঝড় তুলেছিলো। গনমাধ্যমে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সহ কর্মকর্তার অসদাচরণের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার আগেই মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ যিনি বর্তমান বিআরএসএ কমিটির মহাসচিব পদে দায়িত্ব পালন করছেন তার নির্দেশে ছুটিতে চলে যান নকল নবিশ দায়িত্ব পালন করা পলাশ। বিআরএসএ কমিটির মহাসচিব মাইকেল মহিউদ্দিনের ক্যাশিয়ার সাভার রেজিস্ট্রি অফিসের নকল নবিশ পলাশ ও ভেন্ডার সমিতির আহবায়ক আক্তার হোসেন সিন্ডিকেট গড়ে তুলে প্রতি মাসে অর্ধ কোটি টাকা লোপাট করছে। পলাশের ইশারায় দলিলে সই, কর্মকর্তা সাজে দুধের ধোয়া তুলসি পাতা। নকল নবিশ হয়েও পালন করছে সহকারীর দায়িত্ব। কারেকশনের নামে ফাইল পেন্ডিং, এপ্রুভালের জন্য টাকা ছুড়লেই ফাইল সাকসেস। গবমাধ্যমকে চোখ তুলে তাকানোর অভিযোগ সহ বিভিন্ন সময়ে হুমকি ধামকি দিয়ে বিভিন্ন কৌশলে জনসাধারণের থেকে সুবিধা লুট করে ছিলেন উক্ত প্রতিবেদনের অভিযুক্ত ব্যক্তি পলাশ। ঢাকার লাগোয়া এলাকা সাভার সাব রেজিস্ট্রি অফিস সব সময় কর্মব্যস্ত থাকে। প্রতিদিন সেখানে দুই থেকে আড়াই শ বিভিন্ন শ্রেণির দলিল রেজিস্ট্রি হয়ে থাকে। দলিল রেজিস্ট্রি করতে আসা লোকজনের মধ্যে স্থানীয়দের চেয়ে বহিরাগতদের সংখ্যাই বেশি। অনেকেই অগ্নিমূল্যের কারণে ঢাকার ভেতরে জমি কিনতে পারেন না। মূলত তাঁরাই সাভার এলাকায় ছুটে যান। সহনীয় মূল্যে জমিও পেয়ে যান। কিন্তু তা রেজিস্ট্রি করতে আসার পরই শুরু হয় নানা বিপত্তি। টেবিলে টেবিলে ঘুষ, তবে এ শব্দটির বিকল্প উচ্চারণে বলতে হয় ফিস দিচ্ছি। এমন অভিনব কায়দায় আদায় হচ্ছে ঘুষ। কেরানি, মোহরার, টিসি মোহরার, এক্সট্রা মোহরার —সবাই হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকে কথিত সেই ফিসের জন্য। তবে সবচেয়ে বড় ফিসটি দিতে হয় সাবরেজিস্ট্রারকে। তবে সেটা সরাসরি দেওয়ার সৌভাগ্য হয় না। সেটা গ্রহণ করার জন্য তাঁর মনোনীত অফিস সহকারী পলাশ ও মোহরার সিন্ডিকেটের সদস্যরা রয়েছেন।
সাভার সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে নকল নবিশ পলাশ ও দলিল লেখক ভেন্ডার সমিতির আহবায়ক আক্তার হোসেন ও বাকি সদস্যদের আস্কারায় একটি কুচক্র সিন্ডিকেটের আওতায় ঘুষ, দুর্নীতি ও দলিল বাণিজ্যে মেতে উঠেছে। এখানে মোটা অঙ্কের ঘুষ ছাড়া কোনো জমির রেজিস্ট্রি হয় না। দলিল লেখক সমিতির কয়েকজন নেতা, দালাল সিন্ডিকেট ও সাব-রেজিস্ট্রারের কথিত সহকারীর মাধ্যমে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা ঘুষ আদায় করা হয়। এসব টাকা থেকে একটি অংশ স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ‘ম্যানেজ’ করতে খরচ হলেও অধিকাংশই নিজেরা নিজেদের মতো কর্মকর্তাসহ দিনশেষে ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে সাব রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনও নিজ ফায়দা লুটতে ব্যস্ত।
মূলত অধিক লোভের আশায় সিন্ডিকেটকে সক্রিয় রাখতে কখনো কখনো শ্রেণি পরিবর্তন, দৈনিক অনিয়মের মধ্যে রয়েছে নকল উত্তোলনে বাড়তি টাকা আদায়, টিপসইতে একই ঘটনা। এতে করে এসকল কর্মকান্ডে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত তো হচ্ছেই তার চেয়ে মূল বিষয় হলো ২৪ এর ছাত্র জনতার আন্দোলনে সৈরাচার সরকারের প্রেতাত্মারা দেশ পালাতে সক্ষম হলেও এখনও অর্ধেকাংশ প্রেতাত্মা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রেখেছে, যা আগামীর বাংলাদেশকে দূরবর্তী অবস্থানে পৌছাতে বাধা প্রয়োগ করবে।
জমির শ্রেণি বদল করে টাকা হাতানোর এই কৌশলকে বলা হয় ‘আন্ডারভ্যালু স্টাইল’। স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা, জেলা রেজিস্ট্রার অফিস এমনকি ইন্সপেক্টর জেনারেল অব রেজিষ্ট্রার অফিসেও এই টাকার ভাগ যাচ্ছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অফিসে আসা সাধারণ মানুষদের নানা অজুহাতে হয়রানি করা হয়। “কাগজে সমস্যা আছে” বলে ভয় দেখিয়ে নেয়া হয় মোটা অংকের উৎকোচ। জমির সব কাগজ ঠিকঠাক থাকলেও ‘ফ্রেশ জমি’কে ‘ডোবা’, ‘নালা’ বা ‘পতিত’ হিসেবে দেখিয়ে নেয়া হয় বাড়তি ঘুষ। সরকারি নির্ধারিত ফি’র বাইরে দলিলপ্রতি সহকারীর মাধ্যমে আদায় করা হয় অতিরিক্ত অর্থ।
অনুসন্ধানে উঠে আসে, প্রতিদিন অফিস শেষে ভেন্ডার সমিতির সদস্যরা নিত্য দিনের হিসাব অনুযায়ী অতিরিক্ত অর্থ গুলো আলাদা গচ্ছিত রেখে সেখান থেকে অফিস খরচ ও সাব রেজিস্ট্রার ফান্ডের খরচ আলাদা রেখে পলাশের মাধ্যমে পৌছে দেওয়া হয়। নকল নবিশ পলাশের মাধ্যম হয়ে কর্মকর্তার ফান্ডে যুক্ত হয় নিত্যদিনের নিয়মবহির্ভূত অতিরিক্ত অর্থ। এছাড়া অফিসে পলিটিক্যাল, প্রশাসন, জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় সকল কিছুই দেখভাল করেন পলাশ। একজন নকল নবিশ হয়েও দায়িত্ব পালন করছেন সাব রেজিস্ট্রারের একান্ত ঘনিষ্ঠজন হিসেবে।
বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, তিনি প্রতিমাসে গড়ে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষের টাকা আদায় করেন। কোনো কোনো দিন এই অঙ্ক ৮ থেকে ১০ লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যায়। এসব অবৈধ উপার্জনের একটি অংশ নিয়মিতভাবে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের দেওয়া হয় যাতে কেউ প্রশ্ন না তোলে।
এলাকাবাসীর দাবি, প্রতিদিন অফিস শেষে সাব-রেজিস্ট্রার ঘুষের টাকা নিয়ে বাসায় ফেরেন। এই সময় দুর্নীতি দমন কমিশন গোপনে অভিযান চালালে তাকে হাতেনাতে ধরা সম্ভব। সচেতন মহল মনে করছে, তার অনৈতিক কার্যকলাপ রেজিস্ট্রেশন বিভাগের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে, একইসাথে অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সাভারে বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে অনেকেই মনে করছেন, আইন মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন ও আইজিআর দপ্তরের উচিত দ্রুত এই কর্মকর্তা ও তার সহযোগীদের কার্যক্রমের তদন্ত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
এর আগে ২০২০ সালে লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলায় সাব-রেজিস্ট্রার থাকা অবস্থায় মো. জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে আরও একটি বড়সড় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। সেখানে দলিল লেখক ও সাব-রেজিস্ট্রার সিন্ডিকেট করে জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকারের লক্ষ লক্ষ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়। এমনকি আদালতে মামলা চলমান থাকা জমিও তিনি মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে রেজিস্ট্রি করে দেন। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয় স্থানীয়ভাবে।
ধারাবাহিক চলবে…
Leave a Reply